সড়কপথই পছন্দ ব্যবসায়ীদের

বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি হওয়া কনটেইনারের ৯৬ শতাংশ সড়কপথে
৩ শতাংশ রেলপথে
১ শতাংশ নদীপথে আনা-নেওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কনটেইনারে পণ্য পরিবহন চালুর ৪১ বছর পূর্ণ হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার। এই ৪১ বছরেও বন্দর থেকে কনটেইনারে পণ্য পরিবহনে প্রধান ভরসা সড়কপথ। সড়কপথের তুলনায় রেল ও নৌপথে সাশ্রয়ী হলেও এ দুপথে এখনো সেভাবে কনটেইনারে পণ্য পরিবহন হচ্ছে না।

বন্দরের তথ্যে দেখা যায়, কনটেইনার পরিবহন চালুর শুরুতে বন্দর থেকে কনটেইনারের পণ্য আনা-নেওয়া হতো সড়কপথে। বন্দর দিয়ে কনটেইনার পরিবহন চালুর ১০ বছর পর ১৯৮৭ সালে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় কমলাপুর ডিপোতে কনটেইনার আনা-নেওয়ার জন্য রেলপথের সূচনা হয়। সবচেয়ে সাশ্রয়ী মাধ্যম হিসেবে পরিচিত অভ্যন্তরীণ নৌপথে কনটেইনার পরিবহন চালু হয় ২০১৩ সালে। ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে পানগাঁও টার্মিনালে কনটেইনার আনা-নেওয়ার জন্য এই নৌপথ চালু হয়।

এই তিন পথের তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, গত বছর বন্দর দিয়ে মোট কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয় ২৫ লাখ ৬৬ হাজারটি। এসব কনটেইনারের মাত্র ৩ শতাংশ (৭৪ হাজার ৯০৭ টি) রেলপথে আনা-নেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায়। প্রায় ১ শতাংশ (২৫ হাজার ৬৯৮ টি) পরিবহন হয় নৌপথে। আর বাকি ৯৬ শতাংশই (২৪ লাখ ৬৫ হাজার) পরিবহন হয়েছে সড়কপথে।

রেল ও নৌপথে কনটেইনার পরিবহনের হার কম হওয়ার কারণ সম্পর্কে ব্যবসায়ীরা বলছেন, খরচ বেশি হলেও বন্দর থেকে সড়কপথে খুব দ্রুত সারা দেশে নানা কারখানায় পণ্য আনা-নেওয়া করা যায়। ব্যবসায়ীরা পণ্য হাতে পেতে সময়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। নৌপথ ও রেলপথে নানা সমস্যা থাকায় এত দিন সেভাবে পণ্য পরিবহন হয়নি। সমস্যা সমাধানে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ায় সামনে এই দুই পথে পণ্য পরিবহন বাড়বে।

চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারে আনা-নেওয়া পণ্যের ৭০ শতাংশের বেশি চট্টগ্রামের বাইরে ঢাকাসহ সারা দেশের। এ হিসেবে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের সিংহভাগ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পরিবহন হচ্ছে। অথচ অভ্যন্তরীণ নৌপথে এক জাহাজের কনটেইনার পণ্য সড়কপথে পরিবহন করতে হলে ১২০টি কনটেইনার পরিবহনকারী গাড়ি বা ২৪০টি ট্রাক দরকার হয়।

বন্দরের তথ্যে দেখা যায়, এক দশক আগেও মোট আমদানি-রপ্তানি কনটেইনারের ১০ শতাংশ রেলপথে আনা-নেওয়া হতো। তবে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রেলপথে কনটেইনার পণ্য পরিবহন না বেড়ে উল্টো কমেছে। নৌপথের ব্যবহার বাড়লেও তা এখনো মোট আমদানি-রপ্তানির হিসাবে খুবই কম।

জানতে চাইলে বন্দরের চেয়ারম্যান কমোডর জুলফিকার আজিজ গত বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, বিগত কয়েক বছরে রেলপথ, নৌপথ এবং সড়কপথে কনটেইনার পরিবহনের জন্য ব্যাপক হারে অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে। রেলপথ এবং নৌপথে কনটেইনার পরিবহনে যেসব সমস্যা ছিল সেগুলো এখন নেই। ব্যবসায়ীরা এখন নৌপথ ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছেন। নৌপথ এবং রেলপথে কনটেইনার পরিবহন বাড়লে বন্দরের পরিচালন কার্যক্রমে যেমন সুবিধা হবে তেমনি ব্যবসায়ীদেরও আর্থিক সাশ্রয় হবে।

১৯৯৪ সালে ‘পোর্ট গ্র্যান্ডে’ নামে বন্দরের একটি প্রকাশনায় বলা হয়, ১৯৭৭ সালের ২২ মার্চ ‘এসএস টেনাসিটি’ জাহাজের ডেকে আনা হয়েছিল ৬টি কনটেইনার। ওই দিন বন্দর তথা দেশে প্রথমবারের মতো যাত্রা শুরু হয়েছিল কনটেইনার পরিবহনের। এই ৪১ বছরে বন্দর দিয়ে কনটেইনার পরিবহন হয়েছে মোট আড়াই কোটি।

কনটেইনার পরিবহন চালুর আগে সব পণ্যই আনা হতো জাহাজের বিশাল খোলে (হ্যাচে) বস্তাবন্দী বা খোলা আকারে। এতে যন্ত্রপাতিসহ নানা মূল্যবান পণ্য ওঠাতে-নামাতে গিয়ে প্রচুর সময় নষ্ট হতো। কনটেইনার চালু হওয়ার পর পণ্যের সুরক্ষাও নিশ্চিত হয়। বন্দরের তথ্যে দেখা যায়, বন্দর দিয়ে রপ্তানি হওয়া পণ্যের প্রায় শতভাগই কনটেইনারে পরিবহন হয়। জ্বালানি ও ভোজ্যতেল ছাড়া আমদানি পণ্যের মধ্যে ৩৬ শতাংশ পণ্য কনটেইনারে আনা হয়। কনটেইনারে পণ্য পরিবহনের সুবিধা হচ্ছে, সামান্য পরিমাণ পণ্যও বিশ্বের যেকোনো দেশ থেকে সহজে আনা যায়, যেটি কনটেইনার ছাড়া ব্যয়বহুল।

কনটেইনারের জনক ম্যালকম ম্যাকলিন ১৯৫৬ সালের ২৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রে সূচনা করেছিলেন পণ্য পরিবহনে এই বিপ্লবের। ম্যাকলিনের ‘সি ল্যান্ড’ কোম্পানি ১০ বছর পর ১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কনটেইনারে পণ্য পরিবহন ছড়িয়ে দেয় ইউরোপে। এভাবে বিশ্বের নানা দেশ ঘুরে চট্টগ্রামেও চালু হয়ে যায় এই বাহন।

     More News Of This Category